হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাহ: বিস্তারিত নিয়ম ও আমল
হজের ফরজ, ওয়াজিব ও সুন্নাহ জানা প্রত্যেক হাজির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ হজের কিছু আমল বাদ পড়লে হজ সহিহ হয় না, কিছু আমল বাদ পড়লে দম দিতে হতে পারে এবং কিছু আমল
বাদ পড়লেও হজ বাতিল হয় না।
হজ ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। লক্ষ নয় , কোটি মানুষের মনের আকাঙ্ক্ষা। শারীরিক ও আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান মুসলিমের ওপর জীবনে একবার মক্কার কাবায় হজ ফরজ।
আল্লাহ বলেন, “মানুষের মধ্যে যে ব্যক্তি সেখানে পৌঁছার সামর্থ্য রাখে, তার ওপর আল্লাহর জন্য এই ঘরের হজ করা ফরজ।” - সূরা আলে ইমরান, ৩:৯৭
হজের ফরজ কয়টি?
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী হজের প্রধান ফরজ তিনটি। এগুলোর কোনো একটি মূল ফরজ হিসেবে আদায় না হলে হজ সহিহ হয় না।
হজের তিন ফরজ হলো
- ইহরাম গ্রহণ ও হজের নিয়ত করা
- ৯ জিলহজ আরাফার ময়দানে নির্ধারিত সময়ে অবস্থান করা
- তাওয়াফে জিয়ারত করা
এই তিনটি আমল হজের মূল কাঠামো তৈরি করে। অন্যান্য আমল হজকে পূর্ণ করে এবং শরিয়তের নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করতে সাহায্য করে।
মাযহাবভেদে পার্থক্য: হজের ফরজের সংখ্যা ও শ্রেণিবিন্যাসে ফিকহের বিভিন্ন মাযহাবে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। এই আলোচনায় হানাফি ফিকহের প্রচলিত বিন্যাস অনুসরণ করা হয়েছে।
হজের প্রথম ফরজ: ইহরাম ও নিয়ত
ইহরাম বাঁধা: সেলাই ছাড়া সাদা কাপড় পরিধান করার নাম ইহরাম বাঁধা নয়। বরং হজ বা উমরাহ অথবা উভয়টি পালনের নিয়তে ইহরাম বেঁধে দুই রাকাত নামাজ পড়ে নিয়ত করার নাম
ইহরাম। আর ইহরামকারীকে ‘মুহরিম’ বলে।
ইহরামের ফরজ ২টি: (১) নিয়ত করা (২) তালবিয়া পাঠ করা।
ইহরামের ওয়াজিব ২টি: (১) মিকাত বা মিকাতের জন্য নির্ধারিত স্থান থেকে ইহরাম বাঁধা (২) ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা।
ইহরাম বাঁধার নিয়ম: ইহরাম বাঁধার পূর্বে চুল, গোঁফ, নখ ইত্যাদি কেটে পরিষ্কার করে গোসল করে নিতে হবে। আতর সুগন্ধি থাকলে তা শরীরে লাগাতে হবে, তবে ইহরাম বাঁধার পর সুগন্ধি ব্যবহার করা যাবে না।
ইহরাম গ্রহণের পর কিছু বৈধ কাজও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষিদ্ধ হয়ে যায়। যেমন পুরুষের জন্য সেলাই করা পোশাক পরা এবং সুগন্ধি ব্যবহার করার বিধান প্রযোজ্য হয়। ইহরামের নিষেধাজ্ঞা নারী ও পুরুষের ক্ষেত্রে এক নয়।
শুধু ইহরাম নয় , তাওয়াফ কিভাবে করবেন , সাই কিভাবে সম্পন্ন করবেন , আরাফার ময়দানে কি আমল করবেন , মিনা তে কি করণীয় সহ পরিপূর্ণ হজ পালনে কি করবেন -কি করবেন না
এ সমস্ত হজ পালনের বিস্তারিত নিয়ম জানতে হজ গাইডলাইন দেখুন। এছাড়া আমরা অভিজ্ঞ মুয়াল্লিমসহ সফর ব্যবস্থা করি।
হজের প্রস্তুতি ও প্যাকেজ সম্পর্কে জানতে নূর হজ ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের হজ প্যাকেজ দেখুন।
ইহরাম বাঁধার পদ্ধতি
এরপর ইহরামের কাপড় পরিধান করতে হবে। শরীরে কোনো সেলাই করা কাপড় রাখা যাবে না। ইহরামের কাপড় এক খণ্ড লুঙ্গি হিসেবে আরেক খণ্ড গায়ের চাদর হিসেবে পরিধান করে নিবে।
তারপর সুন্নাতুল ইহরাম দুই রাকাত নামাজ পড়বে। এই নামাজে প্রথম রাকাতে সূরা কাফিরুন এবং দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ইখলাস পড়া ভালো। টুপি মাথায় দিয়ে নামাজ পড়ে সালাম ফিরানোর
পর টুপি পাগড়ি রুমাল মাথা হতে নামিয়ে ফেলে খোলা মাথায় ও খোলা মুখে হজ বা উমরার নিয়ত করবে। নিয়তের পর পুরুষরা উচ্চস্বরে তালবিয়া পাঠ করবে। আর মহিলারা অনুচ্চস্বরে
তালবিয়া পাঠ করবে।
তালবিয়া:
لَبَّيْكَ اللَّهُمَّ لَبَّيْكَ، لَبَّيْكَ لَا شَرِيكَ لَكَ لَبَّيْكَ، إِنَّ الْحَمْدَ وَالنِّعْمَةَ لَكَ وَالْمُلْكَ، لَا شَرِيكَ لَكَ
বাংলা উচ্চারণ:
লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইকা লা শারীকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান নি'মাতা লাকা ওয়াল মুলক, লা শারীকা লাক।
অর্থ: হে আল্লাহ! আমি হাজির, আমি হাজির। আপনার কোনো শরীক নাই, আমি হাজির। নিশ্চয় সকল প্রশংসা ও নিয়ামতরাশি আপনারই এবং সমগ্র বিশ্বের রাজত্বও আপনার। আপনার কোনো শরীক নেই।
তালবিয়া পাঠের নিয়ম
তালবিয়া মুখে উচ্চারণে করা জরুরি। যখনই তালবিয়া পাঠ করবেন তখন তিনবার পাঠ করবেন। অধিক পরিমাণে তালবিয়া পাঠ করা মুস্তাহাব। সকাল-সন্ধ্যায় উঠতে বসতে, বাইরে যেতে,
ভিতরে প্রবেশ করতে, লোকজনের সাক্ষাতে, যানবাহনে আরোহণের সময়, অবতরণের সময়, উপরে উঠতে, নিচে নামতে তালবিয়া পাঠ করা মুস্তাহাব।
ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ কাজ
- স্ত্রী সহবাস বা তৎসংশ্লিষ্ট আলোচনা।
- খুশবু ব্যবহার।
- সেলাই করা পোশাক পরিধান করা।
- বগলের লোম উপড়ানো।
- নখের কাজ।
- মাথা ও মুখ ঢেকে রাখা (মহিলারা মাথা ঢেকে রাখবে তবে মুখ ঢেকে রাখবে না)
- নখ, পেশম, চুল উপড়ানো।
- উকুন মারা।
- স্থলজ বা বনজ পশুপাখি শিকার করা।
মীকাত কী?
মীকাত হলো এমন নির্ধারিত স্থান বা সীমা, যার বাইরে থেকে হজ বা উমরার উদ্দেশ্যে আগত ব্যক্তি ইহরাম ছাড়া অতিক্রম করতে পারেন না।
বিমানে সৌদি আরবে যাত্রার সময় মীকাতের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। হাজিকে মীকাত অতিক্রমের আগেই ইহরামের প্রস্তুতি নিতে হয়।
মীকাতের বিধান আগে না জানলে ভ্রমণের সময় ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই ফ্লাইটের রুট, মীকাতের অবস্থান এবং ইহরাম গ্রহণের সময় আগে জেনে নেওয়া উচিত।
হজের দ্বিতীয় ফরজ: আরাফার ময়দানে অবস্থান
আরাফার উকুফ হজের দ্বিতীয় ফরজ। ৯ই জিলহজের সূর্য ঢলে পড়ার পর হতে ১০ই জিলহজের সুবহে সাদিক পর্যন্ত যে কোনো সময় এক মুহূর্তের জন্য হলেও আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করা।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“হজ হলো আরাফা।”
- সুনান আবু দাউদ, সুনান তিরমিজি, সুনান নাসাঈ
এই হাদিস আরাফার উকুফের গুরুত্ব স্পষ্ট করে।
আরাফায় কী করতে হয়?
আরাফায় হাজি দোয়া, জিকির, তালবিয়া ও ইস্তিগফারে সময় কাটান। নিজের গুনাহের জন্য ক্ষমা চান এবং আল্লাহর কাছে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ কামনা করেন।
আরাফার দিনে যে আমলগুলো করতে পারো
- বেশি বেশি দোয়া করতে পারো।
- তালবিয়া পাঠ করতে পারো।
- ইস্তিগফার করতে পারো।
- কুরআন তিলাওয়াত করতে পারো।
- জিকির করতে পারো।
- নিজের পরিবার ও মুসলিম উম্মাহর জন্য দোয়া করতে পারো।
আরাফার দিন শুধু নির্দিষ্ট কোনো দোয়ার মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী দোয়া করা যায়।
হজের তৃতীয় ফরজ: তাওয়াফে জিয়ারত সম্পন্ন করা
তাওয়াফে জিয়ারত হজের তৃতীয় ফরজ। একে তাওয়াফে ইফাদাও বলা হয়। হাজি কাবা শরিফকে কেন্দ্র করে সাত চক্কর তাওয়াফ করেন।
যে তাওয়াফটি ১০ই জিলহজের ভোর হতে ১২ই জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্ত যে কোনো সময় করা হয়।
মনে রাখতে হবে যে, এই ফরজ তাওয়াফের কোনো একটি যদি বাদ পড়ে যায় তাহলে হজ শুদ্ধ হবে না এবং দম বা কুরবানী দ্বারাও উহার ক্ষতিপূরণ হবে না।
তাওয়াফের সময় হাজি কাবা শরিফকে বাম পাশে রাখেন। হাজরে আসওয়াদের দিক থেকে তাওয়াফ শুরু করা হয়।
তাওয়াফে জিয়ারতের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়
- সাত চক্কর সম্পন্ন করতে হয়।
- কাবা শরিফ বাম পাশে রাখতে হয়।
- তাওয়াফ নির্ধারিত স্থান থেকে শুরু করতে হয়।
- তাওয়াফের আদব ও পবিত্রতা রক্ষা করতে হয়।
- তাওয়াফ শেষে সম্ভব হলে দুই রাকাত নামাজ পড়তে হয়।
প্রতিটি চক্করের জন্য আলাদা নির্দিষ্ট দোয়া বাধ্যতামূলক নয়। কুরআনের আয়াত, মাসনুন জিকির এবং নিজের ভাষায় দোয়া করা যায়।
হজের ওয়াজিব কী?
ওয়াজিব হলো হজের এমন গুরুত্বপূর্ণ আমল, যা শরিয়ত হাজির ওপর আবশ্যক করেছে। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী নির্দিষ্ট ওয়াজিব ছুটে গেলে পরিস্থিতি অনুযায়ী দম দিতে হতে পারে।
ফরজ ও ওয়াজিবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ফরজ বাদ পড়লে হজ সহিহ হয় না। অন্যদিকে নির্দিষ্ট ওয়াজিব বাদ পড়লে হজ সহিহ থাকতে পারে, তবে দম বা অন্য সংশোধনী বিধান প্রযোজ্য হতে পারে।
হজের ওয়াজিব ছয়টি
(১) ১০ই জিলহজ রাতে মুযদালিফায় সুবহে সাদিকের পর অবস্থান করা।
(২) সাফা-মারওয়ায় ৭ বার সাঈ করা।
(৩) মিনায় জামারাসমূহে কংকর নিক্ষেপ করা।
(৪) হজে কিরান ও তামাত্তুকারীর জন্য কুরবানী করা।
(৫) মাথার চুল মুণ্ডানো বা ছাঁটার মাধ্যমে ইহরাম খোলা।
(৬) মিকাতের বাইরের লোকদের জন্য বিদায়ী তাওয়াফ করা।
নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোন আমল ওয়াজিব এবং সেটি বাদ গেলে কী বিধান হবে, তা মাযহাব ও হজের ধরন অনুযায়ী পরিবর্তিত হতে পারে।
হজের সুন্নাহ কী?
হজের সুন্নাহ হলো রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হজের পদ্ধতি, আমল ও নির্দেশনা অনুসরণ করা। সুন্নাহ পালন করলে হাজি নবী ﷺ-এর শেখানো পদ্ধতির সঙ্গে নিজের হজকে সামঞ্জস্য করেন।
সুন্নাহ বাদ পড়লে সাধারণভাবে হজ বাতিল হয় না। তবে সুন্নাহকে গুরুত্বহীন মনে করা উচিত নয়। কারণ হজের পূর্ণ পদ্ধতি রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হজ থেকেই শেখা হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমরা আমার কাছ থেকে তোমাদের হজের নিয়ম শিখে নাও।”
সহিহ মুসলিম
হজের সুন্নাত নয়টি
- মিকাতের বাইরের লোকদের জন্য যারা হজে ইফরাদ ও হজে কিরান আদায় করবে, তাদের তাওয়াফে কুদুম করা।
- তাওয়াফে কুদুমের প্রথম তিন চক্করে রমল করা, অর্থাৎ পুরুষরা সজোরে দ্রুত পায়ে, বুক ফুলিয়ে কাঁধ দুলিয়ে তাওয়াফ করা।
- ৮ই জিলহজ দিবাগত রাতে মিনায় রাত যাপন করা।
- ৯ই জিলহজ সূর্যোদয়ের পর মিনা হতে আরাফাতের ময়দানে গমন করা।
- আরাফাতে গোসল করা।
- আরাফাতের ময়দান হতে মাগরিবের ওয়াক্ত হওয়ার পর রওয়ানা হওয়া।
- আরাফাত হতে ফেরার পথে মুযদালিফায় সুবহে সাদিকের পূর্ব পর্যন্ত রাত যাপন করা।
- ৮, ১০, ১১ ও ১২ জিলহজ দিবাগত রাতে মিনায় রাত যাপন করা।
- ১৩ জিলহজ মিনা হতে ফেরার পথে ‘মুহাসসাব’ নামক স্থানে অতি অল্প সময়ের জন্য হলেও যাত্রা বিরতি করা।
হজ শুধু নির্দিষ্ট স্থানে উপস্থিত হওয়ার ইবাদত নয়। হাজিকে নির্ধারিত সময়, স্থান, নিয়ত ও পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়। আরাফার উকুফ, তাওয়াফে জিয়ারত, সাঈ, মুযদালিফা, মিনার আমল এবং কঙ্কর নিক্ষেপের প্রতিটি ধাপ আগে থেকে জানা থাকলে ভুলের ঝুঁকি কমে।
হজে কোনো গুরুত্বপূর্ণ আমল ছুটে গেলে নিজের অনুমানে সিদ্ধান্ত না নিয়ে যোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি। বিশেষ করে দম, ফরজ ছুটে যাওয়া, ইহরামের নিষেধাজ্ঞা এবং তাওয়াফ-সাঈর ভুলের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন।